ভালোবাসার কোনো জাতকুল নেই। নিখাঁদ ভালোবাসা দিলে মানুষের ন্যায় বন্য পশুপাখিরাও মানব জীবনে হয়ে উঠে পরম বন্ধু।
নিঃস্বার্থ ও অবলা পশুপাখি একটু স্নেহ, মমতা আর ভালোবাসার সান্নিধ্য পেলে ভয়ভীতি ভুলে প্রভুভক্ত হয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়। এমনি একজোড়া শালিক পাখিকে পরম স্নেহ-মমতায় লালন-পালন করে পাখি আর মানুষের ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নীলফামারী সদরের কচুকাটা ইউনিয়নের মহব্বত বাজিতপাড়া গ্রামের সনাতন পল্লীর মনোরঞ্জন বর্মণ (৫৫)।
মনোরঞ্জনের ছেলে ভক্তি বিলাস গত ১ বছর আগে রাস্তার ধারে পড়ে থাকা শালিক পাখির ২টি ছানা কুড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে আসেন। এ পাখির ছানা দেখে তার পিতা মনোরঞ্জন খুশির জোয়ারে ভাসেন। শৌখিন প্রিয় ও পাখিপ্রেমী এ মানুষটি খুঁজে পান জীবনের নির্মল আনন্দ বিনোদনের নিঃস্বার্থ পরম বন্ধু ও পরিবারের সৌন্দর্যের অলংকার।তিনি সন্তানতুল্ল্য পরম মমতায় আগলে রেখে পাখির ছানা ২টিকে সেবা-যত্নে বড় করে তুলেন। জোড়া শালিক পাখির আদরমাখা নাম রাখেন কাকা।
এ নাম ধরে ডাকলে বাঁশবাগান কিংবা গাছের মগ ডালে থেকে ছোঁ মেরে উড়ে এসে সারা শরীরে, কাঁধে, মাথায়, হাঁটুতে, হাতের তালুতে লেপ্টে হাঁটাহাঁটি, নাচানাচি করে। খাবারে জন্য করেন চেঁচামেচি। এ সময় অন্য মানুষ সংস্পর্শে এলে ভয়ে উড়াল দেয়। মানুষ সরে গেলে জোড়া শালিক আবার উড়াল দিয়ে এসে খাবারের জন্য তার আপাদমস্তক নাচানাচি আর খুনসুটিতে মাতিয়ে তুলে আশপাশ।
আহা প্রেম! আহা বিশ্বাস! মানুষ আর পাখির এমন পরম মিতালির বিরল দৃশ্য সবাইকে বিস্মিত করে তুলেছে।তার উঠানে জোড়া পাখির খুনসুটি, কিচিরমিচির ডাক, নির্ভয়ে তিড়িংবিড়িং নাচ দেখলে সহজেই মনে হয়, প্রকৃতি মাঝে মাঝে মানুষের কাছে এমন গল্প রেখে যায়, সেগুলো বইয়ের পাতায় নয়, মাটির গন্ধে, স্নিগ্ধ স্নেহে রচিত হয় এক অমর প্রেম কাব্য।
পাখিপ্রেমী মনোরঞ্জন বলেন, পশুপাখির সান্নিধ্য জীবনে এক অমূল্য প্রাপ্তি, যা মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতাবোধ করায়। এরা আমাদের মনকে সুস্থ রাখে। প্রকৃতির কোলে পশুপাখির সঙ্গে সময় কাটালে মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায় এবং জীবন আনন্দময় হয়ে উঠে।
পশুপাখির সান্নিধ্যের মাধ্যমে আমরা তাদের প্রতি মমতা ও ভালোবাসা অনুভব করতে পারি, যা একটি সুন্দর এবং অর্থপূর্ণ জীবনের দিকে নিয়ে যায়।
শৈশব থেকে আমি পশুপাখিকে ভীষণ ভালোবাসি। আগে একটি টিয়া পাখি ছিল, তা কুকুর ধরে খেয়ে ফেলে। এ থেকে মর্মাহত ও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ি ।
এর পর আমার ছেলে নীড়হারা ২টি শালিক পাখির ছানা এনে দেয়। তা পোকামাকড় ও রুটি-কলা খাওয়ায়ে নিবিড় যত্ন আত্তি দিয়ে ধীরে ধীরে বড় করে তুলিছে।এ পাখির পরিবারের অন্য সদস্যের মধ্যে আমার সঙ্গে সখ্য বেশি। আমি যেখানে যাই সেখানে মাথায় ও কাঁধে বসে যায়। তাই কোথাও গেলে তাদের আড়াল করে যাই। এ অবস্থায় বাড়ির উঠান চেঁচামেচিতে অস্থির করে তোলে।
আর তার সহজাত জোড়ায় জোড়ায় শালিক পাখি নিয়ে যাওয়ার জন্য এলে কাছে ছুটে আসে নিজেকে অত্মরক্ষা করে এবং অনেক সময় ঘরের মধ্যে লুকায়।স্বার্থপরতার দুনিয়ায় এমন দৃশ্য দেখে মনে হয় প্রভুভক্ত অবলা পাখিজোড়া আমার জীবনে পরম বিশ্বস্তার (বন্ধু) সঙ্গী ও নিত্য দিনের নির্মল আনন্দ বিনোদনের খোরাক। একই গ্রামের বাসিন্দা ডাবলু হোসেন বলেন, পশুপাখির জন্য ভয় আর আতঙ্ক হলো মানুষ।
এ ধারণা পাল্টে দিয়ে মানুষ আর পাখির মধ্যে বিরল বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছেন মনোরঞ্জন কাকা। আদর-ভালোবাসা দিলে যে সব কিছু জয় করা সম্ভব তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত রেখেছেন তিনি।তার পাখির সঙ্গে এমন মিতালি দেখে মুগ্ধ হই সেই সঙ্গে অভিভুত করে নিজেকে।
যা দেখার জন্য এখানে ছুটে আসি। মানুষের মাঝে বন্ধুত্বের খাদ থাকলেও প্রভুভক্ত পশুপাখির মাঝে কোনো খাদ বা স্বার্থপরতার লেশমাত্র নেই, যা চোখের সামনে দৃশ্যমান। আমার মতো স্থানীয় বাসিন্দারাও এমন দৃশ্য দেখার জন্য ভিড় জমান তার বাড়িতে।

